ফেনীতে কোরবানির চামড়া সংগ্রহে ভরাডুবি, নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার চামড়া
কোরবানির পশুর চামড়া একসময় ছিল মৌসুমি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু ফেনীতে এবার কোরবানির পর ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার চামড়া সংগ্রহের আগেই নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও ফেলে দেওয়া হয়েছে নদী বা ডাম্পিং স্টেশনে। ফলে কোরবানি হওয়া বিপুলসংখ্যক পশুর চামড়ার একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ হারিয়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জেলায় এবার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার গরু, মহিষ ও ছাগল কোরবানি হয়েছে। অথচ সংরক্ষণ করা গেছে মাত্র ৫৯ হাজার ৮৯৪টি চামড়া।
অর্থাৎ প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার চামড়ার কোনো হিসাব নেই। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাস্তবে সংরক্ষিত চামড়ার সংখ্যাও সরকারি হিসাবের চেয়ে কম।
সরকারি হিসাব ও ব্যবসায়ীদের দাবি
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সংরক্ষিত চামড়ার মধ্যে ফেনী সদর উপজেলায় ৪১ হাজার ৪২৯টি, ছাগলনাইয়ায় ৮ হাজার, সোনাগাজীতে ৯ হাজার ১৪০টি, দাগনভূঞায় ৮০০টি, ফুলগাজীতে ২৯০টি এবং পরশুরামে ২৩৫টি চামড়া রয়েছে।
তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য ভিন্ন। তাদের মতে, সংরক্ষণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৪৫ থেকে ৫০ হাজার চামড়া। অনেক চামড়া সংগ্রহের আগেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও কম হতে পারে।
কেন নষ্ট হলো এত চামড়া?
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকটের মূল কারণ ব্যবসায়ীর অভাব। আগে কোরবানির মৌসুমে বহু মৌসুমি ব্যবসায়ী মাঠে নামলেও এখন লোকসানের আশঙ্কায় অনেকে এ খাত থেকে সরে গেছেন।
ফেনীর চামড়া ব্যবসায়ী নূর নবী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আইয়ুব নবী সবুজ বলেন, জেলার বিপুলসংখ্যক চামড়া সংগ্রহ করার মতো ব্যবসায়ী নেই। বর্তমানে ফেনী শহরে বড়-ছোট মিলিয়ে পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যবসায়ী সক্রিয় আছেন। এর মধ্যে বড় ব্যবসায়ী মাত্র দুজন। তাদের পক্ষে অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার চামড়া সংগ্রহ, পরিবহন এবং লবণজাত করা সম্ভব নয়।
এছাড়া চামড়া সংরক্ষণের বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, সময়মতো লবণ ব্যবহার না করা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব এবং শ্রমিক সংকটও বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তুতির ঘোষণা ছিল, ফল মেলেনি
কোরবানির আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চামড়া সংরক্ষণে ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছিল। মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি অস্থায়ী সংরক্ষণাগার স্থাপন এবং পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়।
তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হয়নি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সঠিক নিয়মে চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেননি।
দীর্ঘদিনের সংকটে চামড়া শিল্প
চামড়া সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একটি মৌসুমি সমস্যার চিত্র নয়; বরং দেশের চামড়া শিল্পের দীর্ঘদিনের সংকটের বহিঃপ্রকাশ। ট্যানারি খাতের অস্থিরতা, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত লোকসানের কারণে এ শিল্পে আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী সরওয়ার আলম বলেন, ট্যানারি মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারকে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি সুষ্ঠু লেনদেন ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীরা আবার এ খাতে আগ্রহী হবেন। তখন চামড়া নষ্ট হওয়ার পরিমাণও অনেক কমে আসবে।
প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে সংগৃহীত চামড়া দেশের চামড়া শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। কিন্তু সংগ্রহ ও সংরক্ষণের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ফেনীতে এবার হাজার হাজার চামড়া নষ্ট হওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কার্যকর বাজারব্যবস্থা ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত না হলে আগামী বছরগুলোতেও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে।