ফেনীতে এটিএম বুথে টাকা সংকট, ভোগান্তিতে গ্রাহক
ফেনী: পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ফেনীতে তীব্র নগদ অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ ও শাখায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও টাকা তুলতে পারছেন না গ্রাহকেরা। কোথাও সীমিত লেনদেন, কোথাও আবার এটিএম বুথে ‘টাকা নেই’ বার্তা দেখে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার বিরুদ্ধে।
সোমবার সকাল থেকেই ফেনী শহরের বিভিন্ন এটিএম বুথের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। মঙ্গলবারও একই চিত্র দেখা গেছে শহরের বিভিন্ন এলাকায়। কারও হাতে চেক, কারও হাতে এটিএম কার্ড। কেউ কোরবানির পশু কেনার জন্য টাকা তুলতে এসেছেন, কেউ চিকিৎসা কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে এসেছেন। কিন্তু অধিকাংশ বুথে টাকা না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা।
ফেনী শহরের মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদীন অভিযোগ করেন, কোরবানির গরু কেনার জন্য ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ফেনী শাখা থেকে পাঁচ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে কয়েকদিন ধরে ঘুরছেন তিনি।
তিনি বলেন, “ব্যাংকে নিজের জমানো টাকা থাকলেও প্রয়োজনের সময় পাচ্ছি না। ঈদের আগে পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”
মহিপাল এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুন অভিযোগ করেন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ফেনী শাখায় গিয়ে চাহিদামতো টাকা পাননি তিনি।
তার ভাষ্য, “ব্যবসার জন্য নগদ টাকা দরকার। কিন্তু প্রতিদিন সীমিত টাকা দিচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।”
সোনাগাজীর চরচান্দিয়া এলাকার প্রবাসী পরিবারের সদস্য রুবেল হোসেন বলেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সোনাগাজী শাখায় তার হিসাব থাকলেও বুথে গিয়ে টাকা পাচ্ছেন না।
ফেনী শহরের রামপুর এলাকার গৃহিণী রাশেদা আক্তার অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন ব্যাংকের ফেনী শাখায় টাকা তুলতে গিয়ে একাধিকবার হয়রানির শিকার হয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, “স্বামীর চিকিৎসার জন্য জরুরি টাকা প্রয়োজন। অথচ নিজের জমা টাকা তুলতেই পারছি না।”
দাগনভূঞার ইয়াকুবপুর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নুরুল আফসার জানান, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের দাগনভূঞা শাখা থেকে দোকানের মালামাল কেনার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারেননি।
তিনি বলেন, “ব্যাংকে টাকা রেখে এখন আফসোস হচ্ছে। ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে গেছে।”
ছাগলনাইয়ার পাঠাননগর এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. হানিফ অভিযোগ করেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের ফেনী শাখা থেকে অবসরভাতার টাকা তুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি।
তার ভাষ্য, “ঈদ, চিকিৎসা আর সংসার-সব মিলিয়ে খুব সংকটে আছি। নিজের টাকাই সময়মতো তুলতে পারছি না।”
পরশুরামের মির্জানগর এলাকার প্রবাসীর স্ত্রী শিউলি আক্তার জানান, এক্সিম ব্যাংকের ফেনী শাখা থেকে স্বামীর পাঠানো টাকা তুলতে গিয়ে কয়েকদিন ধরে ঘুরছেন তিনি।
তিনি বলেন, “ঈদের বাজার আর বাচ্চাদের কেনাকাটা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। ব্যাংকে টাকা থেকেও কোনো উপকার পাচ্ছি না।”
এদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত গ্রাহকচাপ ও কেন্দ্রীয়ভাবে নগদ সরবরাহ কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ফেনী শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ঈদের আগে চাপ অনেক বেড়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিমাণ টাকা বিতরণ করা হচ্ছে।”
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ফেনী শাখার ব্যবস্থাপক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা চেষ্টা করছি। গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা নুরুল আমিন বলেন, “তারল্য সংকট কিছুটা রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উন্নতির চেষ্টা চলছে।”
ইউনিয়ন ব্যাংক ফেনী শাখার এক কর্মকর্তা জানান, বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে আগে থেকে আবেদন করতে বলা হচ্ছে।
তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঈদের আগে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। অনেক পরিবার কোরবানি দেওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।