ফেনীতে চাহিদার শীর্ষে মাঝারি গরু-মহিষ, জমে উঠেছে কোরবানির হাট
ফেনী: পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠেছে ফেনীর কোরবানির পশুর হাট। জেলার বিভিন্ন হাটে এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে হাঁকডাক, দরদাম আর পশু কেনাবেচা।
তবে এবারের হাটে বড় আকৃতির গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি আকারের গরু-মহিষের চাহিদাই বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ৯০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে থাকা পশুগুলোর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
সোমবার ফেনী সদর উপজেলার সিও অফিস বাজার, ছাগলনাইয়ার চাঁদগাজী বাজার, জঙ্গলমিয়া বাজারসহ জেলার বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কেউ পরিবার নিয়ে পশু দেখতে এসেছেন, আবার কেউ পছন্দের পশু কিনে বাড়ি ফিরছেন।
ক্রেতারা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর দাম কিছুটা বেশি। বিশেষ করে দেশীয় জাতের মাঝারি আকারের গরুর দাম তুলনামূলক বেশি হাঁকা হচ্ছে। তবে বিক্রেতাদের দাবি, গো-খাদ্য, শ্রমিকের মজুরি ও পরিচর্যা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার কোরবানির জন্য জেলার ছয় উপজেলায় মোট চাহিদা রয়েছে ৮২ হাজার ৫২৫টি পশুর। এর বিপরীতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৯০ হাজার ৪৫২টি পশু, যা চাহিদার তুলনায় ৭ হাজার ৯২৭টি বেশি।
প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে—
গরু ৭১ হাজার ৫৬৯টি
ছাগল ১৩ হাজার ২২৯টি
মহিষ ১ হাজার ৭৩৫টি
ভেড়া ৩ হাজার ৯১৯টি
উপজেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে ছাগলনাইয়ায় ২৪ হাজার ৩৬০টি। এরপর ফেনী সদরে ২২ হাজার ৪১৫টি, সোনাগাজীতে ১৮ হাজার ৩৭৫টি, দাগনভূঞায় ৮ হাজার ৮৭৫টি, পরশুরামে ৮ হাজার ৩৭৮টি এবং ফুলগাজীতে ৮ হাজার ৪৯টি পশু প্রস্তুত রয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলার ছয় উপজেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ১২৯টি পশুর হাট বসছে। এর মধ্যে ১১৪টি অস্থায়ী এবং ১৫টি স্থায়ী হাট। সবচেয়ে বেশি ৪২টি অস্থায়ী হাট বসছে ফেনী সদর ও পৌরসভা এলাকায়।
খামারিরা জানান, ঈদ উপলক্ষে পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত থাকলেও সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশের শঙ্কা রয়েছে। তাদের দাবি, ভারতীয় পশুর কারণে স্থানীয় বাজারে দামের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েন। পাশাপাশি এসব পশুর মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
খামারিরা জানান, ফেনীর খামারগুলোতে ১০০ কেজি থেকে শুরু করে ১ হাজার ২৫০ কেজি ওজনের গরু রয়েছে। লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে প্রতি কেজি ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে পশু।
শহরের পাঠানবাড়ি এলাকার হাসিনা এগ্রোর স্বত্বাধিকারী আরাফাত খান বলেন, “গত দুই বছরের বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে এবার ভালো লাভের আশায় খামারে গরু তুলেছি। কিন্তু খাদ্য ও শ্রমিকের খরচ অনেক বেড়েছে। সেই তুলনায় সরকারি সহযোগিতা খুব একটা পাইনি।”
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “ফেনীতে গবাদিপশুর খামারে নতুন উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। এখানে গরু পালন লাভজনক হওয়ায় তরুণরাও আগ্রহী হচ্ছেন।”
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. দেলোয়ার হোসেন জানান, জেলার ৫ হাজার ৪০৭টি খামারে পশু লালন পালন হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি ও ক্রাইম) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পশুর হাটে জাল টাকা শনাক্তে ব্যাংকের সহযোগিতায় বিশেষ মেশিন বসানো হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
ফেনী বিজিবি-৪ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান জানান, অবৈধভাবে ভারতীয় গরু প্রবেশ ও কোরবানির চামড়া পাচার ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, “কোনো পশুর হাট সড়ক বা মহাসড়কের ওপর বসতে দেওয়া হবে না। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”