বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

বহিষ্কার সমাধান নয়, শিক্ষার্থীদের সচেতন করাই সময়ের দাবি

ফেনীতে টিকটক করার কারণে এক স্কুলছাত্রীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কারের ঘটনা নতুন করে ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে। ঘটনাটি কেবল একজন শিক্ষার্থীর বহিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আমাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বর্তমান প্রজন্মের ডিজিটাল অভ্যাস নিয়ে গভীরভাবে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে।

প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। এসব মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার যেমন জ্ঞান অর্জন, সৃজনশীলতা প্রকাশ ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অসচেতন ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সামাজিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী টিকটক করলেই কি সে অপরাধী? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি করা কি বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্তের যথেষ্ট কারণ? নাকি বিষয়টি নির্ভর করবে ভিডিওর ধরন, প্রেক্ষাপট, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম এবং 

সংশ্লিষ্ট আচরণের ওপর?

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা এখন এমন একটি সময়ে বেড়ে উঠছে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা, অনুসারী সংখ্যা, ভিউ ও লাইক অনেকের কাছে স্বীকৃতি পাওয়ার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবণতা কখনো কখনো তাদের পড়াশোনা, ব্যক্তিগত শালীনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা।

পরিবারের দায়িত্ব কোথায়?

একজন শিক্ষার্থীর নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও আচরণ গঠনের প্রথম প্রতিষ্ঠান পরিবার। সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, অবসর সময়ে কীভাবে সময় কাটাচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে বা তৈরি করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি।

তবে সচেতনতা মানে সন্তানের ওপর অযৌক্তিক নজরদারি কিংবা প্রতিটি বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝানো, অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণে উৎসাহিত করাই হওয়া উচিত অভিভাবকদের প্রধান ভূমিকা।

সন্তান কোনো ভুল করলে তাকে অপমান বা ভর্ৎসনা না করে ভুলের কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কারণ ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে কোনো আচরণ বন্ধ করা গেলেও সচেতনতা তৈরি না হলে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু শাস্তি দেওয়া নয়

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেওয়ার জায়গা নয়; শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, সামাজিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলারও অন্যতম কেন্দ্র।

বিদ্যালয়ের নিয়মনীতি অবশ্যই থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ, অপরাধের মাত্রা, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং শিক্ষার্থীর বয়স বিবেচনায় রাখা জরুরি।

প্রয়োজনে অভিভাবককে ডেকে আলোচনা, সতর্কীকরণ, কাউন্সেলিং কিংবা অন্যান্য আনুপাতিক শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত যেন সর্বশেষ বিকল্প হয় এবং তা যেন যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নেওয়া হয়।

একজন শিক্ষার্থী ভুল করতে পারে। কিন্তু সেই ভুল সংশোধন করে তাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের।

সমাজের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই

আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়—কোনো শিক্ষার্থী বা তরুণ-তরুণী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এলেই তাকে নিয়ে উপহাস, কটূক্তি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু হয়। অথচ এ ধরনের আচরণ সমস্যার সমাধান করে না; বরং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ওপর সামাজিক চাপ তৈরি করে।

বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়, ছবি কিংবা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভুলের সমালোচনা করা যায়, কিন্তু কাউকে অপমান করে সংশোধনের পথ তৈরি করা যায় না।

অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।

শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে নিজেদের দায়িত্ব

শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জায়গা হলেও এর ব্যবহার সম্পূর্ণ দায়িত্বহীন হওয়ার সুযোগ তৈরি করে না। অনলাইনে প্রকাশিত কোনো ছবি, ভিডিও কিংবা মন্তব্যের প্রভাব বাস্তব জীবনেও পড়তে পারে।

তাই ভিডিও তৈরির আগে ভাবতে হবে—কনটেন্টটি কতটা শালীন, এটি অন্য কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা সম্মান ক্ষুণ্ন করছে কি না, নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না এবং ভবিষ্যতে এটি নিজের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে কি না।

পড়াশোনা, পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত বিকাশকে গুরুত্ব দিয়ে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতায় নিজের শিক্ষা, সময়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে অবহেলা করা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আমাদের প্রত্যাশা

ফেনীর স্কুলছাত্রীকে বহিষ্কারের ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে সমাধানের পথে এগিয়ে যাক—এটাই প্রত্যাশা। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত সিদ্ধান্তের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীটির শিক্ষা অব্যাহত রাখার বিষয়টি মানবিক ও ন্যায়সংগতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আমরা টিকটকের অন্ধ ব্যবহারকে সমর্থন করি না, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ুক, সেটিও কাম্য নয়।

মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি নিজে ভালো কিংবা মন্দ নয়; এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব। তাই নতুন প্রজন্মকে প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়, বরং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানোই সময়ের দাবি।

একজন শিক্ষার্থীর ভুল শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজেরও। শাস্তি দিয়ে হয়তো একটি ঘটনা থামানো যায়, কিন্তু সচেতনতা তৈরি করতে পারলেই বদলানো সম্ভব একটি প্রজন্ম।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—শিক্ষার্থীদের হাতে প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু প্রযুক্তি যেন তাদের নিয়ন্ত্রণ না করে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের উপস্থিতি থাকবে, কিন্তু সেই উপস্থিতি যেন শিক্ষা, শালীনতা ও ভবিষ্যতের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।