সব কুরবান, কুরবানি নয়
০১.
আজগর হোসেন। দিনমজুর মানুষ। কোনোরকমে দিনে এনে দিনে খাওয়া সংসার। জীবনের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করেই পথ চলা। তবুও বহু কষ্টে ছেলেটাকে লেখাপড়া করিয়েছেন। ছয় মাস হলো শহরের একটি সরকারি ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে ছেলে। এই প্রথম আজগরের ঘরে কুরবানির আয়োজন। বৃদ্ধ বাবার চোখে-মুখে তৃপ্তি-যেন দীর্ঘ অভাবের জীবনে এ এক ছোট্ট বিজয়।
০২.
সলিম উল্লাহ দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন। হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা গেলেন প্রবাসে। অনেক চেষ্টা করেও সন্তানরা বাবার মরদেহ দেশে আনতে পারেনি। চার সন্তানের সবাই কলেজপড়ুয়া। গ্রাম-সমাজ আর আত্মীয়স্বজনের চাপ- “বাবা নেই, মেয়েগুলোর বিয়ে দিয়ে দাও।” কিন্তু তারা বিয়ে নয়, পড়াশোনা করতে চায়।
নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। বাধ্য হয়ে শহরে ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করেছে তারা। বাবা থাকতে প্রতি বছর তাদের ঘরে কুরবানি হতো। এবার হওয়ার কথা নয়। টিউশনি করে কোনোরকমে সংসার চলে। কুরবানির সামর্থ্য তো দূরের কথা, নিত্যদিনের হিসাবই মেলাতে হিমশিম খেতে হয়।
তবুও বাবার স্মৃতি, সামাজিক চাপ আর নিজের আবেগ মিলিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয়-ঋণ করে হলেও একটা ছাগল কিনবে। কুরবানি দিতেই হবে।
০৩.
পাড়ার কবির আহম্মদ মাস তিনেক আগে ইউরোপ প্রবাসী ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে গরু এসেছে। সেটাই এবার কুরবানির জন্য রাখা হয়েছে। নিজের সামর্থ্য নয়, উপহারের গরুতেই কুরবানির প্রস্তুতি।
০৪.
অন্যদিকে শহরের থানার বড় কর্তা সাইফুল ইসলাম। এ বছর গ্রামের হাটের সবচেয়ে বড় গরুটি কিনেছেন সাত লাখ টাকায়। গলায় ফুলের মালা পরিয়ে লোকজন দিয়ে পুরো বাজার ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে সেই গরু। মানুষ দেখুক— দারোগা সাহেব সবচেয়ে বড় গরু কুরবানি দিচ্ছেন। অথচ এলাকায় ঘুষখোর কর্মকর্তা হিসেবেই তার বেশি পরিচিতি।
**এই চারটি গল্প আমাদের সমাজের চারটি বাস্তব চিত্র। কেউ কুরবানি দিচ্ছেন ত্যাগের মানসিকতা থেকে, কেউ সামাজিক চাপ থেকে, কেউ আবেগে, আবার কেউ লোক দেখানো প্রতিযোগিতায়। অথচ ইসলাম কুরবানিকে কখনোই আবেগ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রদর্শনের বিষয় বানায়নি।
কুরবানি একটি ইবাদত। আর ইবাদতের প্রথম শর্তই হলো সামর্থ্য ও বিশুদ্ধ নিয়ত। ইসলামে কেবল সেই ব্যক্তির ওপরই কুরবানি ওয়াজিব, যার নির্ধারিত আর্থিক সামর্থ্য আছে।
ঋণ করে, লোকলজ্জায় পড়ে, কিংবা মানুষকে দেখানোর জন্য কুরবানি করার কোনো নির্দেশ ইসলাম দেয়নি।
ত্যাগের এই শিক্ষা যদি আত্মশুদ্ধির বদলে সামাজিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তবে কুরবানির প্রকৃত চেতনাই হারিয়ে যায়।